রাতের তারাভরা আকাশের সৌন্দর্য ক্যামেরাবন্দি করা একসময় কেবল পেশাদার আলোকচিত্রীদের বিশাল ট্রাইপড এবং দামি ডিএসএলআর ক্যামেরার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। সাধারণ মানুষের হাতে থাকা ছোট সেন্সরের ফোনে রাতের তারা তুলতে গেলে আসত শুধুই অন্ধকার আর নয়েজে ভরা অস্পষ্ট ছবি। তবে এই কঠিন সমীকরণটি একঝটকায় বদলে দেয় অ্যালগরিদমিক কম্পিউটেশনাল ফটোগ্রাফি। পিক্সেল প্রকৌশলীরা তাদের নাইট সাইট ফিচারটি এমনভাবে উন্নত করেছেন, যা পৃথিবীর নিজ অক্ষে ঘূর্ণন এবং পিক্সেল সেন্সরের সীমাবদ্ধতাকে জয় করে মোবাইল স্ক্রিনে এনে দিয়েছে ছায়াপথের স্পষ্ট ছবি। কীভাবে সম্ভব হলো এই প্রযুক্তিগত বিপ্লব?
রাতের আকাশের দূরবর্তী নক্ষত্রের আলো খুবই মৃদু। প্রচলিত ক্যামেরায় এই আলো পাওয়ার জন্য লং এক্সপোজার বা সেন্সরের শাটার অনেকক্ষণ খোলা রাখতে হয়। কিন্তু এখানে মূল বাধা দুটি—প্রথমত, পৃথিবীর নিজস্ব ঘূর্ণন। শাটার দীর্ঘক্ষণ খোলা রাখলে তারাগুলোর অবস্থান বদলে যায়, ফলে ছবিতে তারার বদলে আলোর রেখা বা ট্রেইল তৈরি হয়। দ্বিতীয়ত, ফোনের ক্ষুদ্র সেন্সরে অতিরিক্ত তাপ ও ডিজিটাল নয়েজ তৈরি হওয়া। এই জোড়া সমস্যা কাটিয়ে উঠতেই জন্ম নেয় আধুনিক স্মার্টফোন অ্যাস্ট্রোফটোগ্রাফি ব্যবস্থা।
পিক্সেল প্রকৌশলীরা দীর্ঘ সময় শাটার খোলা রাখার বদলে বহু সংখ্যক স্বল্পমাত্রার এক্সপোজার নিয়ে তা অ্যালগরিদমের মাধ্যমে যুক্ত করার পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন।
ডিভাইসটি স্থির ট্রাইপড বা কোনো অবলম্বনে রাখা হলে এর সেন্সর ও জাইরোস্কোপ শনাক্ত করে যে ফোনটি পুরোপুরি নিশ্চল। এরপর নাইট সাইট সফটওয়্যারটি একবারে চার মিনিটের কোনো একক ছবি না নিয়ে, টানা ১৫ থেকে ১৬টি ছোট এক্সপোজার গ্রহণ করে। প্রতিটি এক্সপোজার প্রায় ১৬ সেকেন্ডের হয়ে থাকে।
এখানেই মূল জাদু দেখায় ফ্রেম অ্যালাইনমেন্ট প্রযুক্তি। একাধিক ফ্রেম যখন মেটানো হয়, তখন পৃথিবীর গতির কারণে নক্ষত্রগুলো কিছুটা সরে যায়। কম্পিউটেশনাল অ্যালগরিদম প্রতিটি ফ্রেমকে গণিত দিয়ে বিশ্লেষণ করে এবং তারাগুলোকে একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে পুনঃস্থাপন করে যুক্ত করে। এর ফলে নয়েজ সম্পূর্ণ কেটে যায় এবং মোশন ব্লার ছাড়াই পরিষ্কার নক্ষত্রমণ্ডল ফুটে ওঠে।
রাতের আকাশের প্রসেসিং আর ভূমির গাছের ডাল বা পাহাড়ের প্রসেসিং এক নয়। তারা প্রক্রিয়া করার সময় যদি ভূমির অংশকেও একইভাবে টিউন করা হয়, তবে ছবির ভেতরের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। এই জটিলতা এড়াতে ব্যবহার করা হয় সেমান্টিক সেগমেন্টেশন।
একসময় যা ছিল বিশালাকার টেলিস্কোপ ও লেন্সের কাজ, তা এখন পকেটে থাকা ছোট্ট ডিভাইসের সফ্টওয়্যার কোডের কল্যাণে হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। হার্ডওয়্যারের সীমাবদ্ধতাকে দূরদর্শী সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং দিয়ে অতিক্রম করার এই ঘটনা পুরো মোবাইল ইন্ডাস্ট্রিকে এক নতুন দিকনির্দেশনা দিয়েছে। প্রযুক্তি ও অ্যালগরিদমের এই মেলবন্ধন আমাদের কেবল ছবি তোলার সুবিধাই দেয়নি, বরং রাতের আকাশ দেখার দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে দিয়েছে। আগামী দিনে এই স্মার্টফোন অ্যাস্ট্রোফটোগ্রাফি প্রযুক্তিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আরও যুক্ত হয়ে রাতের ছবি তোলার অভিজ্ঞতাকে কোথায় নিয়ে যায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
আপনি কি কখনো মোবাইল দিয়ে রাতের তারা বা ছায়াপথের ছবি তোলার চেষ্টা করেছেন? আপনার অভিজ্ঞতা এবং পিক্সেলের এই প্রযুক্তি সম্পর্কে কী ভাবছেন, কমেন্টে আমাদের জানান!









